1. info@haornews24.com : Haor News : Haor News
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৮ পূর্বাহ্ন

বাঙালি জীবনে পহেলা বৈশাখ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত সময় : সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪৯ বার দেখেছেন

ড.মো.আজিজুল হক

রাজশাহী:



বাঙালি জাতিসত্তার অন্যতম স্মরনীয় ও বরণীয় দিন বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংষ্কৃতিক সংগঠন প্রস্তুতি গ্রহণ প্রায় শেষ করে ফেলেছে। আমরা বর্তমান নিবন্ধে খুব সংক্ষেপে বাঙালি জাতির সমাজ ও সংষ্কৃতিতে অবস্থান নেওয়া পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে আলোচনা করবো। এবারে পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিবর্তে সরকারি সিদ্ধান্তে অনুষ্ঠিত হবে বৈশাখী শোভাযাত্রা।
প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে বর্তমান পৃথিবীতে ১৯৫ টি দেশের মধ্যে ১৫০ টির বেশি ভাষা পরিবার রয়েছে, যার মধ্যে প্রচলিত আছে ৭৪৭৪ টি ভাষা(সূত্র: ইউকিপিডিয়া)। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। এরমধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী হলো বাঙালি। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবাংলা ও আসামে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের বসবাস। বাঙালি জাতির রয়েছে একান্ত নিজস্ব ইতিহাস এবং ঐতিহ্যগত সুষ্পষ্ট আলাদা ধারা। যুগ যুগান্ত ধরে বাঙালি জাতিগোষ্ঠী নিজেদের প্রথাগত সামাজিক ও সাংষ্কৃতিক আচার-আচরণ, ধ্যান ধারণা, রীতি-নীতি অনুসরণ করে চলেছে। বাঙালির বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ সংষ্কৃতি একদিনে গড়ে ওঠেনি। আমাদের পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ধরন কালপরিক্রমায় একশ্রেণির সংষ্কৃতিপ্রেমির প্রাণের উৎসবে পরিণত হলেও পহেলা বৈশাখ উদযাপন নিয়ে রয়েছে দৃষ্টিভংঙ্গিগত পার্থক্য।
বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য হিসেবে পহেলা বৈশাখে বিভিন্ন ধরনের উৎসব ও খেলাধুলা অনুষ্ঠিত হতো। দু:খজনক হলেও সত্য যে, নগরায়ন ও বিশ্বায়নের প্রভাবে বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্যবাহি খেলা যেমন হাডুডু, বৈশাখি মেলা, নেকৈা বাইচ, ঘোড়দৌড় ইত্যাদি খেলা, নববর্ষের ফসলকাটা উৎসব বা মাঙ্গন দেওয়া ইত্যাদি হারিয়ে যেতে বসেছে। শহরাঞ্চলে আধুনিক প্রজন্মের ধারণা পহেলা বৈশাখ বলতেই রমনার বটমূলে গানের আসর কিংবা আনন্দ শোভাযাত্রা অথচ এই আনন্দ শোভাযাত্রা শুরুই হয় বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় শতকে ধর্মনিরপেক্ষে উৎসব বলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এ সময়ে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে মঙ্গল শোভাযাত্রা চালু হয়, যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।
তবে পহেলা বৈশাখ উদযাপন নিয়ে কারো কারো মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদেরকে সংস্কৃতির সংজ্ঞা পর্যালোচনা করতে হবে। সংষ্কৃতি হলো, আমরা যা, তাই হলো আমাদের সংস্কৃতি অর্থাৎ জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত আমরা যা কিছু করি, কাই আমাদের সংস্কৃতি। আমাদের নামকরণের ধরন, খাদ্যাভাস, পোষাক-পরিচ্ছদ, আত্মীয়তার ধরন, লোকাচার, প্রথা-প্রতিষ্ঠান, বিশ্বাস, জন্ম-বিবাহ-মৃত্যু কেন্দ্রিক অনুষ্ঠান সবকিছুই সংষ্কৃতির অংশ। তাই ঘটা করে শোভাযাত্রা, পান্তা ইলিশ মানেই পহেলা বৈশাখ নয়, এটি একটি উপাদান হতে পারে। পহেলা বৈশাখ উদযাপনের নামে রমনার বটমূলে সূর্যদ্বয়ের সাথে সাথেই রবীন্দ্রনাথের ‘ মুছে যাক গ্লানি’ অথবা এসো হে বৈশাখ, এসো গান দিয়ে শুরু করা কারো কারো দর্শন ও বিশ্বাস হতে পারে কিন্তু সমগ্র বাঙালি জাতিসত্তা বিশেষত: মুসলিম জাতিসত্তার নয়। কারণ সূর্যদয়ের পূর্বে তারা মসজিদে সালাত আদায় করে নতুন বছরে ভালোভাবে চলার তৌফিক কামনা করে আল্লাহর কাছে দোওয়া করে।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম হাতিয়ার ধর্ম। ধর্ম মানুষকে স্ব ইচ্ছায় নিয়ন্ত্রণ করে। ধর্ম মানুষকে ভালো ও মন্দ, পাপ ও পুণ্য কাজের শিক্ষা দেয়। কি করা উচিৎ বা কি অনুচিৎ, তাও বোঝে। চুরি করা, মিথ্য বলা, ব্যভিচার করা, নেশা করা ইত্যাদি কাজগুলো করতে ধর্মই নিষেধ করে। তাই যে কোনো অনুষ্ঠানের নামে কতটুকু করা যায়? তা ধর্ম শিক্ষা দেয়। ইসলাম ধর্মে যে কোনো মূর্তি, প্রতিকৃতি হারাম, তাই উদ্ভুট মুখোশ পড়ে আপনি আনন্দ করতেই পারেন কিন্তু এটি বাঙালির সার্বজনীন উৎসব, তা বলতে পারেন না।

মুসলমানরা দিনের শুরুতে ফজরের নামাজ পড়ে এবং একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য চায়। তাই শোভাযাত্রার শুরুতেই মঙ্গলবাতি জ¦ালিয়ে বোবা হয়ে দাড়িয়ে থাকা বা মঙ্গল প্রার্থনা করা অন্য ধর্মের রীতি হমে পারে তবে তা ইসলাম ধর্মের নয়।
যারা এসব ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে বিতর্ক তৈরী করতে চান, তাদের জন্য বিবেচ্য বিষয় হলো, আমরা হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি বসবাস করছি। একই দেশ, একই ভাষা, একই বাঙালি জাতি। কিন্তু খেয়াল করে দেখুন, হিন্দুদের জল, দাদা, বউদি আর মুসলমানের পানি, ভাই, ভাবী সম্বোধন রীতি এক হয়নি। আলী হোসেন, মো: জাব্বার এবং নিমাই, হারাধন, নগেন নামকরণেও কিন্তু বুঝা যায়, কে কোন ধর্মের? তাই ধর্মীয় দৃষ্টিভংগীগত কারণে বর্ষবরণের পথ ও পদ্ধতি, বিশ্বাস আলাদা হতেই পারে। এ নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার ও মতবিরোধ তৈরী করার সুযোগ নেই; যেমন ঢাকা বিশ^দ্যিালয়ের চারুকলা বিভাগের উদ্যোগে চালু করা শোভাযাত্রার নাম ছিল আনন্দ শোভাযাত্রা, পরে হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এবার সরকারি নির্দেশে বৈশালী শোভাযাত্রা। এর পিছনেও থাকতে পারে রাজনৈতিক মতাদর্শ ও বিশেষ উদ্দেশ্য।

সাধারণভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, মোঘল সম্রাট আকবর আমলে ১৫৫৬ সালে ফসলকাটা ঋতুর উপর ভিত্তি করে বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ শুরু হয়। তবে এ নিয়েও ঐতিহাসিকগগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কারো মতে বাংলা দিনপুঞ্জি চালু করেন ৭ম শতকের রাজা শশান্ক, কারো মতে শুর্শিদ কুলি খান। তবে মোঘল সম্রাট আকবরই তার শাসনামলে রাজস্ব আদায়ের জন্য প্রবর্তিত করেন এবং ব্যাপকভাবে তা চালু হয়। এখনো সে ধারাবাহিকতায় চৈত্র মাসের শেষে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীগণ হালখাতা সম্পন্ন করেন। এটিও বাঙালি সংস্কৃতি ও বৈশাখের সাথে সম্পর্কিত।

ড. মোঃ আজিজুল হক
আঞ্চলিক পরিচালক
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
( পি আর এল)
সাবেক পরিচালক, ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর সাংষ্কৃতিক একাডেমি, রাজশাহী।
তারিখ: ১৩/০৪/২৬

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিস্তারিত